গর্ভধারণের জন্যে ভিটামিন-ডি

গর্ভধারণের জন্যে ভিটামিন-ডি কেন প্রয়োজন?

সেয়ার করুনঃ

গর্ভধারণের জন্যে ভিটামিন-ডি প্রয়োজন। বর্তমানে মেয়েদের ডিম্বাণুর সমস্যা, ছেলেদের শুক্রানুর সমস্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার ফলে অনেক চেষ্টা করেও গর্ভধারণ হচ্ছে না। এর অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে শরীরে ভিটামিন-ডি এর ঘাটতি হওয়া। ভিটামিন ডি গর্ভধারণ এবং প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি শরীরের ক্যালসিয়াম শোষণ এবং হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্যই কেবল গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং গর্ভধারণ ও প্রজনন স্বাস্থ্যেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভিটামিন ডি, গর্ভধারণ ও প্রজজন স্বাস্থ্যের উপর কীভাবে কাজ করে তা নিয়ে আজকে বিস্তারিত আলোচনা করবো ইনশাল্লাহ।

ভিটামিন ডি এর সাথে গর্ভধারণ ও প্রজজন স্বাস্থ্যের সর্ম্পক:

১) হরমোন ভারসাম্য রক্ষা করে:

আমাদের মস্তিষ্কের একটি গ্রন্থি আছে যার নাম hypothalamus. এই hypothalamus এর নিচে একটি গ্রন্থি থাকে যার নাম পিটুইটারি গ্রন্থি। এই পিটুইটারি গ্রন্থি থেকেই শরীরের বিভিন্ন হরমোন নিয়ন্ত্রণ হয়। ভিটামিন ডি হাইপোথ্যালামাস ও পিটুইটারি গ্রন্থিকে প্রভাবিত করে, যা আমাদের প্রজনন হরমোন নিঃসরণ ও নিয়ন্ত্রণ করে। ভিটামিন-ডি মেয়েদের এস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরন নামক হরমোনের মাত্রা সঠিক রাখতে সাহায্য করে। যা ডিম্বাণু উৎপাদন এবং গর্ভধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। পুরুষদের ক্ষেত্রে, ভিটামিন-ডি টেস্টোস্টেরন উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করে, যা শুক্রাণুর পরিমাণ এবং গুণমান বৃদ্ধি করে। এখন কারো যদি শরীরে ভিটামিন-ডি এর ঘাটতি থাকলে তাহলে শরীরে হরমোনের তারতম্য হবে এবং মেয়েদের ডিম্বাণু ও ছেলেদের শুক্রানুর গুণগত মান নষ্ট হবে। ফলে বাচ্চা নিতে সমস্যা হবে।

গর্ভধারণের জন্যে ভিটামিন-ডি
গর্ভধারণের জন্যে ভিটামিন-ডি

২) গর্ভধারণের জন্যে ভিটামিন-ডি কেন প্রয়োজন?

ভিটামিন ডি ডিম্বাণুর বিকাশে এবং ডিম্বাশয়ের কার্যকারিতা উন্নত করে। ছেলেদের শুক্রাণুর গুণগত মান কেমন তার নির্ভর করে শুক্রানুর পরিমাণ, গতিশীলতা বা motility এবং শুক্রানুর ডিএনএ-এর উপর। ভিটামিন-ডি শুক্রানুর পরিমাণ, গতিশীলতা এবং ডিএনএ এর গুণমান ভালো রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া মেয়েদের ক্ষেত্রে ওভুলেশনের জন্যে মাসিকের নির্দিষ্ট সময়ে ডিম্বাণুর আকার কমপক্ষে ১৮ মি: মি: হতে হয়। ডিম্বাণুর আকার ছোট হলে ওভুলেশন হয় না। ভিটামিন-ডি ডিম্বাণুর আকার বৃদ্ধি করে ফলে ওভুলেশন এবং গর্ভ রোপনে সহায়তা করে৷ এখন কারো যদি ভিটামিন-ডি এর ঘাটতি থাকে তাহলে শুক্রানুর বা ডিম্বাণুর সমস্যা হবে। ফলে গর্ভধারণ হবে না। এজন্যে গর্ভধারণের জন্যে ভিটামিন-ডি প্রয়োজন।

৩) রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাঃ

ওভুলেশনের পরে গর্ভধারণের জন্যে শরীরে রোগীর প্রতিরোধ ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা জরুরি, যাতে মায়ের শরীর Implantation বা গর্ভরোপন হয়। ভিটামিন ডি ইমিউন সিস্টেমের কাজ নিয়ন্ত্রণ করে এবং গর্ভধারণের সম্ভাবনা বাড়ায়।

৪) ইনফ্ল্যামেশন বা প্রদাহ কমানো:

শরীরে কোন ইনফেকশন বা প্রজজন তন্ত্রে কোন ইনফরমেশন থাকলে প্রজনন ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ভিটামিন ডি প্রদাহ কমিয়ে ডিম্বাশয় এবং জরায়ুতে একটি স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি করতে সহায়ক।

৫) অ্যান্টি-মুলেরিয়ান হরমোন (AMH) বৃদ্ধি:

একজন নারীর শরীরে গর্ভধারণের জন্যে কতগুলো ডিম্বাণু জমা আছে সেটা বুঝা যায় AMH এর মাধ্যমে। AMH ডিম্বাশয়ের ডিম্বাণু উৎপাদনের সক্ষমতা নির্দেশ করে। ভিটামিন ডি এর সঠিক মাত্রা AMH বাড়াতে সাহায্য করে, যা প্রজনন ক্ষমতা বাড়ানোর ইঙ্গিত দেয়। কারো যদি শরীরে ভিটামিন-ডি এর ঘাটতি থাকে তাহলে ডিম্বাণুর মান নষ্ট হয়ে

গর্ভধারণের জন্যে ভিটামিন-ডি
গর্ভধারণের জন্যে ভিটামিন-ডি

যায়। ফলে গর্ভধারণে সমস্যা হয়। এজন্যে গর্ভধারণের জন্যে ভিটামিন-ডি প্রয়োজন।

৬) এন্ডোমেট্রিয়ামের উপর প্রভাব:

জরায়ুর ভিতরের স্তরের নাম Endometrium. ওভুলেশনের পরে যখন শুক্রাণু ডিম্বাণু মিলিত হয়ে ভ্রূণের তৈরি হয়, তখন ভ্রূণটি জরায়ুর ভেতরের অংশ এন্ডোমেট্রিয়ামে এসে বসে যায়। এবং গর্ভধারণ করেন। ভিটামিন ডি এন্ডোমেট্রিয়ামকে গর্ভধারণের জন্য আরও গ্রহণযোগ্য করে তোলে।

৭) পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম (PCOS):

PCOS মহিলাদের মধ্যে বন্ধ্যাত্বের একটি বড় কারণ। শরীরে হরমোনের তারতম্য এবং ইনসুলিন রেসিস্ট্রেন্স এর কারণে PCOS হয়। ভিটামিন ডি ইনসুলিন রেজিস্টেন্স এবং হরমোন ভারসাম্য স্বাভাবিক করে PCOS থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।

 ৮) আইভিএফ (IVF) সাফল্যের হার বাড়ানো:

গবেষণায় দেখা গেছে, যে-সব মহিলাদের রক্তে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি থাকে, তাদের আইভিএফ-এর মাধ্যমে গর্ভধারণের সাফল্যের হার বেশি।

ভিটামিন ডি এর দৈনিক চাহিদা:

বয়সের ওপর ভিত্তি করে পরিমান ভিন্ন হয়,

শিশু জন্মের পর থেকে ১ বছর পর্যন্ত: ৪০০ IU (International unit) প্রতিদিন প্রয়োজন।

– বয়স ১-৬০ বছর পর্যন্ত: ৬০০ IU (International unit) প্রতিদিন প্রয়োজন।

– বয়স যদি ৬০ বছরের বেশি হয়: সেক্ষেত্রে ৮০০ IU (International unit) প্রতিদিন প্রয়োজন।

গর্ভবতী মা বা বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ান এমন মায়ের জন্য: ৬০০ IU (International unit) প্রতিদিন প্রয়োজন। তবে এক্ষেত্রে কিছুটা অতিরিক্ত নেয়া উত্তম।

ভিটামিন ডি এর উৎস:

বিভিন্ন উৎস থেকে ভিটামিন-ডি পাওয়া যায়। যেমন

১) সূর্যের আলো,

২) খাবার,

৩) মেডিসিন থেকে।

১) সূর্যের আলো:

ভিটামিন-ডি এর প্রথম প্রধান উৎস হলো সূর্যের আলো, আমাদের দৈনিক যে পরিমাণ ভিটামিন-ডি প্রয়োজন তার ৮০ ভাগ আসে সূর্যের আলো থেকে।

a yellow sun with a logo
গর্ভধারণের জন্যে ভিটামিন-ডি

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, দিনের কোন সময় সূর্যের আলোতে থাকা উচিত?

উত্তর: কতক্ষণ থাকা উচিত ভিটামিন ডি এর জন্যে সকাল ১০ টা থেকে দুপুর ৩ টার মধ্যে প্রতিদিন ২০-৩০ মিন অথবা সপ্তাহে ১০০ মিনিট সূর্যের আলোতে অবস্থান করলে প্রায় ৮০ ভাগ ভিটামিন-ডি এর চাহিদা পূরণ হবে। তবে ব্যক্তি যদি কালো হয় তাহলে ৩০-৪০ মিনিট থাকতে হবে। কারণ যাদের ত্বকের রং কালো তাদের ত্বকে মেলামিন নামক উপাদান থাকে। মেলামিন সূর্যের আল্টাভায়োলেট বি রশ্নি ত্বকে পৌঁছতে বাধা দেয়। ফলে কালো ত্বকের মানুষের ভিটামিন-ডি কম শোষণ হয়।

শরীরের কত টুকু অংশ খোলা রাখবেন?

যতটা সম্ভব খোলা রাখুন, বেশ রাখলে বেশি বেনিফিট, তবে ২০-৩০ মিনিট রোধের থাকলে শরীরের ১৮% বা ২ হাত যথেষ্ট। তবে বেশি সময় তীব্র রোদে থাকা উচিত নয় এতে হিট স্ট্রোক হতে পারে।

 ২) খাবার:

ভিটামিন-ডি বাকি ২০ % আসে খাবার থেকে

– খাবারের মধ্যে cod liver oil এ ভিটামিন ডি সবচেয়ে বেশি থাকে। বলা হয় চা ১ চামচে থাকে ১৩৬০ IU থাকে, যা আমাদের দৈনিক চাহিদার দ্বিগুণ।

কী কী খাবার থেকে ভিটামিন ডি পাওয়া যায়?

ক) চর্বিযুক্ত মাছ বা সামুদ্রিক মাছ: বিশেষ করে সেলমন, টোনা মাছে প্রায় ১০০ গ্রাম ওজনের এক টুকরো মাছে ভিটামিন-ডি থাকে ৭০০ IU

খ) গরুর কলিজা: গরুর কলিজা ভিটামিন ডি এর অন্যতম উৎস।

গ) মাখন: ভিটামিন ডি এর জন্য মাখনও ভাল উৎস (তবে চেষ্টা করবেন মাখনটা নিজের হাতে বানানোর)

ঘ) ডিমের কুসুম: তারপরে আসছি ডিমের কুসুম, কিন্তু বর্তমানে ডিমের কুসুমে তেমন পাওয়া যাচ্ছে না, কারণ ফার্মের মুরগির গায়ে রোদ পড়ে না যার কারণে কুসুমের রং ফ্যাকাশে হয়, তাতে ভিটামিন ডি এর পরিমাণ কম থাকে সেই দিক থেকে দেশী হাসঁ/মুরগির ডিম হতে পারে বেস্ট অপশন।

ঙ) মাসরুম: মাসরুমও ভিটামিন-ডি এর অন্যতম উৎস।

এছাড়া রয়েছে কাঠ বাদাম, দুধ ও দুধের তৈরি খাদ্য দ্রব্য, উন্নত দেশগুলোতে যদিও দুধের সাথে আলাদা ভিটামিন-ডি মিশিয়ে বাজার জাত করা হয় যা আমাদের দেশে হয় না। এবং সবশেষে কমলা লেবু। এই খাবার গুলো ভিটামিন ডি এর উৎস হিসেবে অন্যতম।

৩) মেডিসিন:

খাবার ও সূর্যের আলো ছাড়াও সরাসরি ভিটামিন ডি খাবার ট্যাবলেট পাওয়া যায়, এক্ষেত্রে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক খেতে হবে। তবে খাবারে মাধ্যমে ভিটামিন ডি নিতে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ এক্ষেত্রে ভিটামিন ডি বেশি হয় না। আপনি যদি বন্ধ্যাত্ব নিয়ে চিন্তিত হন বা গর্ভধারণের পরিকল্পনা করেন, তবে ভিটামিন ডি-এর মাত্রা পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। ভিটামিন ডি এর ঘাটতে হলে বাচ্চা নিতে সমস্যা হবে।

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *